অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ‘শিউলি এন্টারপ্রাইজ’র অন্তরালে ফয়সালের আন্তর্জাতিক জালিয়াতি সিন্ডিকেট
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৫ মার্চ, ২০২৬
রাজধানীর বনশ্রীভিত্তিক ‘শিউলি এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আহমেদের প্রতারণার জাল এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। দুবাই থেকে জাফরান চোরাচালান ও নকল পণ্য বাজারজাতকরণের পর এবার মালয়েশিয়া ভিত্তিক কসমেটিকস ব্র্যান্ড ‘সেভি বিউটি’ (Savee Beauty) এবং চায়না থেকে আমদানিকৃত পণ্যের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
কসমেটিকস বাণিজ্যে বহুমাত্রিক প্রতারণা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফয়সাল আহমেদ মালয়েশিয়ার ‘সেভি বিউটি’র সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে শিউলি এন্টারপ্রাইজের নামে কসমেটিকস আমদানি শুরু করেন। তবে এই ব্যবসার আড়ালে তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করছেন। শুধু তাই নয়, একই কোম্পানির মালিকানা এবং ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউশন’ দেওয়ার নামে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
ইভেন্টের নামে পরিচালককে প্রতারণা
সেভি বিউটির প্রচারণার জন্য আয়োজিত তথাকথিত ‘অ্যাওয়ার্ড শো’ ইভেন্টকেও আয়ের মাধ্যম বানিয়েছেন ফয়সাল। অভিযোগ রয়েছে, দেশের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীকে দিয়ে ইভেন্ট করিয়ে তাকে ৪০ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন ফয়সাল। কিন্তু আজ পর্যন্ত পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া কোম্পানির সাধারণ কর্মচারীদের বেতন না দিয়েই অন্যায়ভাবে ছাঁটাই করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
১ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্টের ফাঁদ
ফয়সালের প্রতারণার বড় শিকার হয়েছেন মির্জা মেহেদী হাসান। বাংলাদেশে ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ফয়সাল তাকে দিয়ে চীন থেকে কসমেটিকস, পারফিউম ও স্ন্যাকস আইটেম প্রস্তুত করান। পরবর্তীতে শিউলি এন্টারপ্রাইজের নামে ‘ওয়ার্ক অর্ডার’ দিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল বুঝে নিলেও কোনো টাকা বা লভ্যাংশ দেননি। উল্টো পাওনা টাকা চাইলে ফয়সাল তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই কায়দায় ‘কসমো মার্ট’-এর মালিক মিজানের সাথে এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউশনের চুক্তি করে তার সাথেও প্রতারণা ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন এই চক্রের প্রধান।
তারকাদের সাথে ছবি ও ‘ভার্চুয়াল’ দুবাই অবস্থান
ফয়সাল আহমেদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের জনপ্রিয় তারকাদের সাথে ছবি পোস্ট করে নিজের প্রভাব জাহির করেন। এমনকি তিনি দেশে অবস্থান করলেও ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে নিজেকে দুবাইতে আছেন বলে প্রচার করেন, যাতে পাওনাদাররা তাকে খুঁজে না পায়।
সোহাগ-রবিন বাহিনীর ‘রিকভারি’ আতঙ্ক
টাকা আত্মসাতের পর যখনই কেউ পাওনা দাবি করেন, তখনই ফয়সাল তার নিজস্ব বাহিনী লেলিয়ে দেন। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী তোতলা সোহাগ ও রবিন, এবং তার সহযোগী কালা লিটন ও রাসেল ভুক্তভোগীদের বাসায় গিয়ে বা ফোনে অস্ত্রের মুখে হুমকি প্রদান করে। এই সশস্ত্র বাহিনীর ভয়ে অনেকেই আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আড়াল
পুরো প্রক্রিয়াটি ফয়সাল তার মা শিউলি আলমের নামে করা ‘শিউলি এন্টারপ্রাইজ’ এবং বনশ্রীর ই-ব্লকের গোপন আস্তানা থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও ভাই সাইদ আহমেদ রাফি এই অর্থপাচার ও জালিয়াতির অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ:
একাধিক ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে ফয়সালের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা, চেক জালিয়াতি ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে অভিযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বনশ্রী ও আফতাবনগর এলাকায় ফয়সালের অবস্থান শনাক্তে কাজ চলছে।